ভূমিকা
"ভিলেনরা খুব দরকারি। তারা যত ভয়ংকর হবে, যত নিষ্ঠুর নৃশংস হবে, তত আমাদের ভয় লাগবে বেশি। আর ততই আনন্দ হবে তাদের পতনের সময়। বুদ্ধু ভূতুম গল্পে যখন রাজার পাঁচ রানি আর পাঁচ রাজপুত্রকে তাদের ঘরবাড়ি সমেত মাটি আর কাঁটা চাপা দিয়ে মেরে ফেলা হয়, তখন তাদের জন্য দুঃখ হয়নি। তারা ভিলেন বলেই। ভিলেন তো আর ঠিক মানুষ নয়, রাক্ষস বা দৈত্যেরই সমগোত্রীয়। ছোটদের গল্পে, রূপকথার গল্পে তাই রাক্ষস, দৈত্য, ড্রাগন বা চক্রান্তকারী মন্ত্রীদেরই বাড়বাড়ন্ত। একজন হিরো ততটাই বড় আর মহান যতটা খারাপ তার প্রতিদ্বন্দ্বী ভিলেনটি।
এই ছদ্ম প্রতিপক্ষের হিংস্র, অ-মানুষিক আচরণগুলো তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো উদার, দয়ালু, সাহসী হিরোর হিংস্রতাকে বৈধতা দেয়। এই বৈধতা আবার সামাজিক তথা সাম্প্রদায়িক হিংস্রতাকেও জাস্টিফাই করতে পারে নানাভাবেই। এই যে বইটি আপনারা পড়তে চলেছেন বা পড়ে ফেলেছেন ইতিমধ্যেই; এর লেখক কিন্তু ভিলেনদের প্রায় অদৃশ্য রেখেছেন তাঁর গল্পগুলোতে।
গল্পের প্রধান চরিত্র এক রাজ্যের রানিমা। তাঁর আসল নাম কেউ জানে না। অনেক ছোটবেলায় বিয়ে হয়ে এই রাজ্যে এসেছেন তাই নিজেও ভুলে গেছেন। এই পর্যন্ত পড়ে রানিমার দুঃখে কাতর হওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেবেন বলে যাঁরা ভাবছেন, তাঁদের উদ্দেশ্যে লেখক জানিয়ে দিলেন ‘রানির নাম ছিল না এমন যেন কেউ না ভাবে। রানি নিজেই নিজের অনেকগুলো নাম দিয়েছিলেন। সকালে যখন তিনি ফুল তুলতেন তখন তাঁর নাম হত ‘মালিনী’। তারপর যখন তিনি নদীতে স্নান করতে যেতেন তখন তাঁর নাম হয়ে যেত মৎস্যকন্যা। স্নান করে মন্দিরে পুজো করতে যাওয়ার সময় আবার নাম পালটে হয়ে যেত শ্রীমতী। তারপর যেতেন রন্ধনশালায়। তখন তাঁর নাম হত রন্ধন পটীয়সী। আর সন্ধ্যেবেলা যখন জানলার কাছে বসে মেঘ বৃষ্টি দেখতেন, তখন তাঁর নাম হত স্থির সৌদামিনী। রাজা অবশ্য তাঁকে মাঝে মাঝে আদর করে মিনি বলে ডাকতেন। কিন্তু ভুল সময়ে সে নামে ডাকলে রানি সাড়া দিতেন না। এইভাবে সুখে দুঃখে রানির দিন কাটছিল।‘ এই রানিমাকে ভালো না বেসে উপায় নেই। এই রানিমারই নানা গল্প নিয়ে গড়ে উঠেছে বইটি।
বিভিন্ন সমস্যায় পড়ে রানিমা নিজের বুদ্ধিবলে বা রাজপুত্র রাজকন্যাদের সাহায্য নিয়ে কী ভাবে সেগুলো থেকে বেরিয়ে আসছেন, রাজ্যকে মুক্ত করছেন যুদ্ধের বিপদ থেকে,গড়ে তুলছেন বীরাঙ্গনা বাহিনী, তারই কাহিনী ছড়িয়ে রয়েছে এর পাতায় পাতায়। সুব্রতা দাশগুপ্তের অন্যান্য লেখায় যে অদ্ভুতত্ত্ব আমরা লক্ষ্য করেছি, বিশেষ করে আগে প্রকাশিত বিড়াল বা এ আই এর গল্পসংকলনে ঠিক সেরকম অদ্ভুত নয় কিন্তু অলৌকিকতা, যাদু,- এর ছোঁয়া আছে এই গল্পগুলোর মধ্যেও। কিন্তু প্রায় সমস্তক্ষেত্রেই লক্ষ্য করার যে, সমস্যা বা ক্রাইসিস তৈরি করার জন্য লেখক কোনও ব্যক্তি বা সম্প্রদায়কে দায়ী না করে দায়ী করেছেন সিস্টেমকে। প্রায় সমস্ত ক্ষেত্রেই পুরুষতন্ত্রের কাঠামোর মধ্যে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা এক রানিমার এই গল্পগুলো, এক নতুন স্বাদ নিয়ে এসেছে বাংলা সাহিত্যে।"
রানি কাহিনী
Bengali