ভারতশিল্পে নারীমূর্তি সদারহস্যময়। ঠিক তেমনই রহস্য ছেয়ে থাকে অজন্তার গুহায়। শুধু গুহায় নয়, তার বাইরে পারিপার্শ্ব জুড়ে। সেই ১৮২৪-এ সিক্সটিন্থ দ্য কুইন্স ল্যান্সার্স রেজিমেন্টের লেফটেন্যান্ট জেমস আলেকজান্ডার, প্রায় এক সহস্রাব্দী লোকচক্ষুর আড়ালে পড়ে থাকা পরিত্যক্ত গুহাগুলি খুঁজে পাওয়ার পর থেকেই বহু পণ্ডিত, ইতিহাসবিদ, গবেষক, শিল্প-বিশারদ অজন্তায় ছুটে এসেছেন এবং এখানকার ভিত্তিচিত্র দেখেছেন, মুগ্ধ হয়েছেন, প্রতিলিপি তৈরি করেছেন এবং নানাবিধ অনুসন্ধান চালিয়েছেন। অজন্তাচিত্রের আকর্ষণে এখনও ছুটে আসেন বহু শিল্পী, শিল্পরসপিপাসু মানুষ এবং সাধারণ পর্যটক।
আবহমান চলতে থাকা গবেষণায় অজন্তা সম্পর্কে বহু তথ্য যেমন আলোয় এসেছে তেমনই এখনও অজানা থেকে গিয়েছে অনেককিছু। যেমন বলা যায় ‘অজন্তা’ নামটির কথা। এর উদ্ভব ইংরেজি ‘এজেন্ট’ শব্দ থেকে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে এই অঞ্চল ছিল হায়দ্রাবাদের নিজামের রাজত্বে। সেখানে কোম্পানির রেসিডেন্ট এজেন্টের ঠিকানা ছিল গুহাগুলির অদূরে ফর্দাপুর-আওরঙ্গাবাদ সড়কের লাগোয়া ‘অজন্টা’ বা ‘অজিন্ঠা’ গ্রামে। ওই নামটি ‘এজেন্ট’ শব্দ থেকেই এসেছিল। তার থেকেই নামকরণ গুহাসমূহের। এখানে যখন পাহাড় কুঁদে গুহা নির্মাণ হল, তার দেওয়ালে যখন ছবি আঁকলেন শিল্পীরা, যখন এখানে নিয়মিত চর্চা চলত বৌদ্ধশাস্ত্রের, যখন বুদ্ধের উপাসনা চলত নিয়মিত তখন কী নামে পরিচিত হত এই অঞ্চল বা কী হিসেবে চিহ্নিত হত এখানকার অধ্যাপন ও অধ্যয়নের কেন্দ্র, ইতিহাস আজও তা জানতে পারেনি।
ঠিক এইরকম রহস্যময়ী এখানকার চিত্রে আঁকা নারীরা। দেবী থেকে সম্রাজ্ঞী, রাজনন্দিনী থেকে সখী, পরিচারিকা বা সাধারণ পৌরনারী হিসেবে তাঁরা উপস্থিত অজন্তার ভিত্তিচিত্রে। তাঁদের বেশভূষা, ভাব, চেহারা প্রভৃতিতে দর্শক মুগ্ধ হন, আকৃষ্ট হন। সেইসঙ্গে আশ্চর্যও হতে হয়। কারণ পরবর্তী যুগের সামাজিকতা, ঐহিকতা বা মূল্যবোধের সঙ্গে এই নারীদের বাহ্যরূপ একেবারে মেলে না। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে কী ভেবে এঁদের প্রতিকৃতি আঁকা হয়েছিল? কাদের চেহারার অনুকরণে শিল্পীরা এই নারীদের রূপ কল্পনা করেছিলেন?
এমন প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর হয়তো কখনোই খুঁজে পাওয়া যাবে না। তবুও সেইসব প্রশ্ন ও সেগুলির সম্ভাব্য উত্তর প্রসঙ্গে কিছু আন্দাজ অনুমান আর তাদের পিছনে থাকা যৌক্তিক বা অযৌক্তিক সিদ্ধান্তের সন্ধান করা হল অজন্তার নারীদের বর্ণ-ছন্দ-লাবণ্য-সৌষ্ঠব-যৌবন প্রভৃতির প্রাসঙ্গিক আলোচনায়। এখানকার ভিত্তিচিত্রে আঁকা নারীকুলের সামগ্রিক বিবরণ বা গাইড বই বলা চলে না এই বইটিকে। বরং বলা যায়, এই গ্রন্থে স্পর্শ করতে চেষ্টা করা হয়েছে অজন্তা-সুন্দরীদের রূপ-সজ্জা-ভাব-ভঙ্গি-বর্ণিকা প্রভৃতির পিছনে থাকা প্রেরণাকে, যা থেকে শিল্পীরা উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন এই অনবদ্যাঙ্গীদের সৃজনে।
গ্রন্থে আলোচিত বিষয়বস্তুর বিশ্লেষণের প্রয়োজনে গুহার অভ্যন্তরে গৃহীত আলোকচিত্র এবং গোলাম ইয়াজদানী, স্যর জন গ্রিফিথ্স প্রমুখের করা প্রতিলিপি ব্যবহার করা হয়েছে। শিল্পী মুকুল দে-র আঁকা কৃষ্ণা রাজকুমারীর স্কেচটি এবং অন্য রেখাচিত্রগুলি প্রকাশের অনুমতি দিয়ে কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করেছেন ‘মুকুল দে আর্কাইভে’-র কর্ণধার ও পরিচালক সত্যশ্রী উকিল মহোদয়। আলোচনার অনুষঙ্গে কোনো চিত্রের বর্ণনায় দিক বলা থাকলে তা গণ্য করতে হবে দর্শকের অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে। কখনো ছবিতে আঁকা চরিত্রের প্রেক্ষিতে হলে, তা বিশেষভাবে নির্দিষ্ট করা হয়েছে।
প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
অজন্তা সুন্দরী
Bengali