শিল্পীর মনের হদিশ, শিল্পের মানসভূমি
- Suman Dalui
- Dec 22, 2021
- 2 min read
"পাঠকদের শুধু মনে রাখতে অনুরোধ করি, 'শিল্পী' শব্দটির তাৎপর্য বহুদূর প্রসারিত হতে পারে। চলচ্চিত্রের সংগীতের নাট্যের চিত্রের ভাস্কর্যের সাহিত্যেরই শুধু নয়, শিল্পী কেউ হতে পারেন জীবনেরও, যাপনেরও।"—'নিরহং শিল্পী' বইয়ের ভূমিকায় লেখকের এই কথাগুলিকে সঙ্গী করেই পাঠক যাত্রা শুরু করেন স্মৃতির এক আশ্চর্য সরণি বেয়ে। এই বইয়ের বারোটি অনবদ্য নিবন্ধে সমুজ্জ্বল হয়ে রয়েছে এমন কিছু শিল্পীর কথা যাঁরা নিজ নিজ সৃষ্টির জগতে অতুলনীয় হয়েও আত্মম্ভর নন। তাঁদের প্রতিভা ও দক্ষতা তাঁদের অহংকারী করে তোলেনি, তাঁদের অধীত বিদ্যা তাঁদের বিনয়ী করেছে। তাঁরা নম্র এবং দৃঢ় চরিত্রের মানুষ। উদ্ধত নন, কিন্তু আত্মসম্মানবোধে প্রখর। দুর্বিনীত না হয়েও অন্যায়ের প্রতিবাদ করার মতো মেরুদণ্ডের জোর তাঁদের ছিল। আর তাই তাঁদের সঙ্গলাভের সুখস্মৃতি কবি শঙ্খ ঘোষের অপূর্ব গদ্যে আলোর ফুলকি হয়ে ঝরে পড়েছে এই বইয়ের পাতায় পাতায়। লেখক আক্ষেপ করেছেন: "কত সময়েই আমাদের দেখতে হয় অযোগ্যের আস্ফালন!" অথচ প্রকৃত যোগ্য ব্যক্তি নিরহং আচরণের দ্বারা মন থেকে ক্লেদ দূর করে সামিল করতে পারেন অনাবিল সুন্দর এক অভিজ্ঞতায়। সেই অভিজ্ঞতার বিন্দুগুলোই জীবনের পরম সম্পদ হয়ে ওঠে। প্রকৃত শিল্পী পারফর্ম করার সময়ে তাঁর সমস্তটুকু নিংড়ে দেন, নিজের শিল্পের সঙ্গে কোনোরকম আপোস তিনি করেন না। তাই রাধামোহন ভট্টাচার্যের মতো বিশিষ্ট বাচিকশিল্পী ও অভিনেতা জীবনের উপান্তে পৌঁছে অজ্ঞাতকুলশীলদের আয়োজিত "তুচ্ছ" অনুষ্ঠানেও নিজেকে উজাড় করে দেন। অনুষ্ঠানে তাঁকে যে কবিতাংশ বা গদ্যাংশ গীতি-আলেখ্যের মাঝে পাঠ করতে হবে, তার আগে-পরে কী ছিল সেসব গভীরভাবে না জেনে নিয়ে তিনি তৃপ্ত হন না। কারণ তাঁর পাঠ অভিঘাতহীন ও নিষ্প্রাণ হয়ে পড়ুক—এ তিনি চান না। রুপোলি পর্দার রূপবান নায়ক বসন্ত চৌধুরী অনুজপ্রতিম কবির বাড়িতে এসে বুঝে নিতে চান কবির লেখা যে অংশ তিনি পাঠ করবেন তাতে তাঁর স্বরভঙ্গি যথাযথ নাকি পরিবর্তন দরকার। খ্যাতির চূড়ায় থেকেও তাঁদের এই বিনতি লেখককে মুগ্ধ করে, বিস্মিত করে পাঠককেও। মান্না দে থেকে গীতা ঘটক, লেডি রাণু মুখোপাধ্যায় থেকে রানী মহলানবিশ—অনেক গুণী মানুষের সমাগম এই বইতে। তাঁরা প্রত্যেকেই ভাস্বর তাঁদের আপন দ্যুতিতে। প্রখ্যাত রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সুচিত্রা মিত্র ও কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রেষারেষিকেই অনেক জায়গায় প্রবলভাবে প্রচার করা হয়। কিন্তু তাঁদের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্যের যে বন্ধন ছিল তা ফুটে ওঠে 'চিরকিশোরী' নামক নিবন্ধটিতে। শান্তিনিকেতনের 'আশ্রমকন্যা' অমিতা সেনের পরম স্নেহ, লীলা মজুমদারের সান্নিধ্য কবির হৃদয় স্পর্শ করে। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, সুকুমার সেন, শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, শশিভূষণ দাশগুপ্ত, সুখময় ভট্টাচার্য, মণীন্দ্রকুমার ঘোষের মতো বঙ্গীয় সারস্বত সমাজের দিকপাল ব্যক্তিত্বদের মনীষা খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করার সৌভাগ্য লেখকের পরম পাওয়া। জীবনের নানা সময়ে সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বিচরণ করতে করতে লেখক এইসব স্মরণীয় মানুষদের খুব কাছ থেকে দেখেছেন আর ঋদ্ধ হয়েছেন তাঁদের জীবনচর্যা উপলব্ধি করে। তাঁদের জীবনদর্শন তাঁকে পথ দেখিয়েছে, দৈনন্দিন ক্লিষ্ট ও অবসন্ন ভাব থেকে মুক্তি দিয়েছে। স্মৃতির সেই টুকরোগুলো তিনি একত্রে এই বইতে সাজিয়ে দিয়েছেন পাঠকের জন্য। 'নিরহং শিল্পী' বর্তমান পাঠককে মুখোমুখি করে এমন এক সময়ের, যখন কিছু হয়ে ওঠার থেকে কিছু করার অদম্য ইচ্ছেতেই সওয়ার হতেন বেশিরভাগ মানুষ। সহজে বাজিমাত করার চেষ্টা না করে সাধনায় মগ্ন হওয়ার সময় সেটা, নিজেকে এবং পারিপার্শ্বিক সমাজকে সংশোধন করতে করতে উত্তরণের পথে এগিয়ে যাওয়ার সময়। আজ যখন স্বার্থপর অক্ষমের আত্মম্ভরিতা ও অন্তঃসারশূন্যতায় চারিদিক দূষিত, তখন এই বইয়ের লেখাগুলো পাঠকের মনে কয়েক পশলা বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে আর দূর করে দেয় সকল মলিনতা। # বই: নিরহং শিল্পী/লেখক: শঙ্খ ঘোষ/প্রকাশক: তালপাতা/প্রচ্ছদ: দিলীপকুমার/বিনিময়: ₹২০০
Comments