তুষার ভট্টাচার্য্য
মন্টুদা এসে বসল আমাদের টানা লম্বা লাল রঙের দক্ষিণের রোয়াকে।
জবাগাছের নীচে মন্টুদার ডবল ফর্কওলা হাম্বার সাইকেল। ওই সাইকেলেই হাফপ্যাডেল থেকে ফুল প্যাডেল, তারপর সিটে চেপে সাইকেল চালানো শিখেছি। তারপর তো একদিন দু’হাত ছেড়েও সাইকেল চালিয়ে ফেললাম। ওফ! কী ব্যালেন্স আমার! হ্যাণ্ডেলে হাত না দিয়ে, মানে হাত ছেড়ে সাইকেল চালানোয় যা মস্তানি, তা আর কিছুতে নেই। কত লোক দেখত, আমি হাত ছেড়ে সাইকেল চালাচ্ছি। আমি গ্যাসবেলুন হয়ে যেতাম।
মন্টুদা আমাদের সবার প্রিয় রামানুজ জামাইবাবুর ভাই, পাশের বামুনপাড়ায় থাকে।
বামুনপাড়াতেই তো সারদামণি বিদ্যামন্দিরে ইনফ্যান্ট ক্লাসে আমি, দাদা বুড়ি দিদিমণির কাছে পড়েছি। বুড়ি দিদিমণি মানে সত্যিই বুড়ি, ধপধপে সাদা চুল, সাদা শাড়ি। কী ভালবাসত আমাদের সবাইকে। আর ছিল মুটু দিদিমণি।
বাজারের পর যে রাস্তাটা বাউনপাড়া হয়ে সরস্বতী নদী পার করে অনন্তপুরের দিকে চলে যায়, তখন সেটা ছিলো কাঁচা রাস্তা, এক হাঁটু ধুলো। ফুটবলে লাথি মারার মতো সেই ধুলোতে লাথি মারতে মারতে ইস্কুলে যেতাম। পা ভর্তি ধুলো হয়ে যেত। বৃষ্টির সময়ে এক হাঁটু কাদা হতো ওই রাস্তায়। রাস্তার পাশে একটা তালগাছ ছিলো, তাতে অনেক বাবুই পাখির বাসা। সারা বছর অসংখ্য গরুর গাড়ি ক্যাঁচ কুঁচ আওয়াজ করতে করতে ওই রাস্তা দিয়ে যেত। সেসব গরুর গাড়ির নীচের দিকে একটা কালো হয়ে যাওয়া চিমনি লাগানো হারিকেন দুলত। বেশিরভাগ গরুর গাড়ি কলার কাঁদি দিয়ে ভরা।
স্কুল আরম্ভের সময় প্রার্থনা হতো। এখন সেটা রেশন দোকান, দুর্গাপুজর সময় সেই দোকান খালি করে পুজো হয়, এটা ছিলো আমাদের ইনফ্যান্ট ক্লাস। তখন কত বয়স আমার? চার। ক্লাসটা এখনো আছে, একটা লম্বা ঘর। বাঁ পাশেই লাইব্রেরি। লাইব্রেরির জায়গায় একসময়ে ছিলো শিবমন্দির। সেই শিবমন্দির ভেঙে লাইব্রেরি। এসব বড়োদের মুখে শুনেছি। লাইব্রেরির সামনে একটা বাঁধানো জায়গা। এই জায়গাতে পুজোর সময় নাটক, গান এসব হয়। ডানপাশে শিবঠাকুরের মন্দির। লাল রঙের মন্দিরের গায়ে টেরাকোটার কাজ। তারও পাশে এখনকার ইট-কাঠ-গ্রিল-মোজাইকের বিশালাক্ষী মন্দির। মন্দিরের পেছনদিকে শানবাঁধানো ঘাট, মস্ত এক পুকুর। মন্দির হলেই তার পেছনদিকে একটা পুকুর মাস্ট। এ আমি আমাদের শহরে, অন্য জায়গাতেও দেখেছি। এই বিশালাক্ষী মন্দির তৈরি হয়েছিল ৯০৬ বঙ্গাব্দে। খলিসানি গ্রামের জমিদার ছিলেন করুণাময় বসু। তিনি এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
এই মন্দির, লাইব্রেরির সামনে অনেকটা লম্বা-চওড়া উঠোন। উঠোনের পরে কাঁচা রাস্তা ওই রাস্তা দিয়ে কাঁচের বাক্সয় ভরা নরম ছোট ছোট লালচে রঙের তুলোর মত দেখতে বল বিক্রি করতে করতে একজন চলে যেত। হেঁটে যাবার সময়ে সেই লোকটা একটা ছোট ঘন্টা বাজাত — টুং, টুং, টুং।ওই ঘন্টার আওয়াজ পেলেই বুড়ি দিদিমণির থেকে মুখ ঘুরিয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতাম ওই কাচের বাক্সটার দিকে। আমরা সেই বলকে বলতাম 'বুড়ির চুল'। অন্য কোথাও একে 'হাওয়া মিঠাই'ও বলে। এক নয়া, মানে এক নয়াপয়সা দাম ছিল ওই বুড়ির চুলের। কোনোদিনই খেতে পারিনি সেই 'বুড়ির চুল'।
পকেটে পয়সা থাকার প্রশ্নই নেই তখন। আর, পকেটও তো ছিলো না। ইজেরের কি পকেট থাকে! ওই বুড়ির চুলকে এখন বলে, 'ক্যাণ্ডি ফ্লস'। মেলা-ট্যালায় খুব বিক্রি হয়, সাইজে বড়, দামও অনেক। ও এখন ফ্যাশান আইটেম।
ক্লাস-ঘরটার উত্তর দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আমরা প্রার্থনা করতাম। আসলে এই ঘরটা দুর্গাপুজোর জন্যেই নির্দিষ্ট করা। ওই উত্তর দিকের দেওয়ালে একটা মোটা কড়া লাগানো আছে। ওই যে, দুর্গাঠাকুরের কাঠামোটা পেছন দিক দিয়ে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়, ওই মোটা লোহার কড়াতে। এখনও আছে ওই কড়াটা। প্রার্থনার সময়ে ওই কড়া মুঠো করে ধরতে আমার খুব ভালো লাগত। ওই কড়াটা ধরেই আমি প্রার্থনা করতাম।
মন্টুদাকে ন’জ্যাঠাবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “কী ব্যাপার মন্টু?” মন্টুদা বললো, “বাউনপাড়ার সব বাচ্চা ছেলেমেয়েদের নিয়ে কলকাতায় চিড়িয়াখানা দেখাতে নিয়ে যাব ভেবেছি। অনেকেই যাবে। আমি চাইছি আশিস, কল্যাণ, শেখর আর তুষার আমাদের সঙ্গে যাক।"
আশিসদা, কল্যাণদা আমার জ্যাঠতুতো দাদা, আর আমার ওপরের দাদা শেখরদা। আমি ধারেকাছেই ছিলাম, মন্টুদার থেকে সাইকেলটা চেয়ে নিয়ে একটু চালাব বলে ... কলকাতা, তারপরে আবার চিড়িয়াখানা! এসব শুনে তো আমার উঠোনে ডিগবাজি খেতে ইচ্ছে করছিলো। কিন্তু ডিগবাজি না খেয়ে মন্টুদার পাশেই দাঁড়িয়ে রইলাম, জ্যাঠাবাবু কী বলেন সেটা শোনার জন্যে। জ্যাঠাবাবু মন্টুদাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “কিসে যাওয়া হবে আর কত টাকা লাগবে ইত্যাদি। মন্টুদা বললো, বাসে যাব আমরা, স্টেশনে যে বাস চলে, 'জয়দুর্গা' বাস, সেই বাস ভাড়া নিয়েছি আর মাথাপিছু দু'টাকা করে লাগবে। দুপুরের খাবার যে যার নিজের নিয়ে যেতে হবে।”
তখন চন্দননগরে স্টেশন থেকে বাস ছাড়ত, সেই বাস তালডাঙা, কোর্ট হয়ে আবার চন্দননগর স্টেশনে ফিরে আসত।
জ্যাঠাবাবু মন্টুদার সঙ্গে আরো কীসব কথা বলে চারখানা লাল দু'টাকার নোট মন্টুদাকে দিয়ে দিলেন। মানে, আমরা বাসে করে চিড়িয়াখানা দেখতে যাচ্ছি। এবার আনন্দে ডিগবাজী খাওয়াই যেতে পারত। খাওয়া হল না। মন্টুদার সাইকেলটাও চালানো হলো না। কিন্তু মনে হল, আমি যেন পাখি হয়ে গেছি।
এসে গেল সেই দিন। ভোরবেলা আপনা থেকেই ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। তারপর চান করে, ভরপেট ঘি-আলুসেদ্ধ-ভাত খেয়ে বিশালাক্ষী মন্দিরের সামনে আমরা সবাই লাল-নীল সোয়েটার পরে জড়ো হলাম--রঙের মেলা।
এবার হেঁটে চন্দননগর স্টেশন। বাস তো রেললাইনের নীচ দিয়ে এপারে আসবে না, তাই ওই স্টেশনে গিয়েই বাসে উঠতে হবে। স্টেশন চত্বরের বিরাট মেহগনি গাছের নীচে বাসটা দাঁড়াত। ওই মেহগনি গাছে অনেক পাখি ছিলো।সন্ধ্যাবেলায় হাজার হাজার পাখি ফিরে আসত ওই গাছে। তাদের সমবেত গানে ওই স্টেশন চত্বর ভরে থাকত।
বাস ছেড়ে দিল। জিটি রোড দিয়ে বাস চলল কলকাতার দিকে। তখন তো এখনকার মতো দিল্লি রোড ছিল না।
পৌঁছে গেলাম চিড়িয়াখানা। দেখলাম হাতি-ঘোড়া-বাঘ-সিংহ... পুকুরটায় হাজার হাজার নানা রঙের, নানা সাইজের পাখি — উড়ছে, ডানা ঝাপটাচ্ছে, কত কী করছে। ডানা ঝাপটানো জলে রোদ্দুর চকচক করে উঠছে। বড়রা বললো, ওরা সব নানা দেশ থেকে এই শীতকালে উড়ে আসে কোলকাতায়। শীত শেষ হলে আবার যে যার নিজেদের বাড়ি ফিরে যায়। এদেরকে বলা হয় পরিযায়ী পাখি।
এবার খাবার পালা। বিরাট মাঠের অনেক জায়গাতে অনেকে বসে আছে, অনেকে সতরঞ্চি পেতে খাওয়াদাওয়া করছে, কেউ কেউ বল নিয়ে খেলছে। ঘাসের ওপর আমরা সবাই বসলাম। আমরা চার ভাই একটু কাছাকাছি বসলাম।
আশিসদার হাতে চার থাকওলা পেতলের টিফিন বাক্স। সেই টিফিন বাক্সটার পাশে চ্যাপ্টা রড, ওপরের বাক্সটায় ক্লিপ দিয়ে আঁটা।কাঁসার রেকাবিতে আশীষদা মা-জেঠিমার করে দেওয়া লুচি-আলু চচ্চড়ি আমাদের ভাগ করে দিলো, ন্যাতানো লুচিগুলো কেমন গায়ে গায়ে লেগে ছিল। ওপরের টিফিনবাক্সয় রসগোল্লা, সেটা শেষে খাওয়া হবে। আমরা খাচ্ছি।
হঠাৎ উল্টোদিকে নজর পড়লো। দেখলাম আমাদের সঙ্গে আসা ঝন্টুদা-লিন্টুদা তাদের টিফিনবাক্স খুলছে।টিফিনবাক্সটা কী চকচক করছে রে বাবা! রোদ্দুর ঠিকরে পড়ছে ওই টিফিনবাক্স থেকে। পরে জেনেছি, ওই টিফিনবাক্সগুলো স্টেনলেস স্টিলের। আমাদের বাড়িতে ওসব তখন ছিল না। ওগুলো নাকি ম্যাড্রাসে পাওয়া যায়, খুব দাম, বড়োলোকেরা ম্যাড্রাস বেড়াতে গেলে কিনে আনে।
এরপর স্ট্রেট ভূমিকম্প হল। দেখলাম, ঝন্টুদা-লিন্টুদা দুজনে একটা একটা গোটা ডিম নিয়ে খোলা ছাড়াচ্ছে। এ কী রে বাবা! ওরা কি এক একজন একটা করে 'গোটা ডিম' খাবে নাকি! হ্যাঁ, ঠিক তাই! ওরা দু’ভাই লুচি তরকারির সঙ্গে একটা একটা গোটা ডিম কামড়ে কামড়ে তাতে একটু একটু নুন দিয়ে খেতে লাগল। আমি আমার লুচি খাওয়া ভুলে ওদের ওই গোটা ডিম খাওয়া দেখতে লাগলাম। আমার দেখাদেখি, দেখলাম দাদারাও খাওয়া ভুলে সেই কাণ্ড দেখছে। একজন এক-একটা গোটা, আস্ত ডিম! এ তো আমরা ভাবতেই পারছি না। আমরা যদি কখনও ডিম খাই, আধখানাই খাই, বাড়িতে তো তাই দেয়। আলু দিয়ে লম্বা ঝোল আর আধখানা ডিম। গোটা ডিম! এ তো স্বপ্ন। এ তো ভূমিকম্প।
তারপর ভাবলাম, ঝন্টুদারা গোটা ডিম খাবে নাই বা কেন! কেনই বা ওদের স্টেনলেস স্টিলের টিফিন বাক্স থাকবে না! ওরা তো বড়োলোক! ওদের কত বড়ো বাড়ি! লোহার গজাল দেওয়া ইয়াব্বড় দরজা, কত বড়ো আমবাগান, লিচুবাগান, কত জমি... ওরা যে বোসবাড়ির ছেলে, জমিদার করুণাময় বসু-র বংশধর।